যেখানে রেখেছিলাম | ছোটগল্প | দৈনিক সংবাদ | আনিসুজ জামান

যেখানে রেখেছিলাম | ছোটগল্প | দৈনিক সংবাদ | আনিসুজ জামান

— চল্লিশ বছর ধরে যে চাকরিটা করলেন, সেটা ছাড়লেন কেন?

লোকটা কিছুটা সময় চুপ করে থেকে বলল— ওদের জ্বালায় আর পারছিলাম না।

— কার জ্বালায়

— ওদের জ্বালায়

— গোরস্থানের মালিকদের?

লোকটা মাথা নাড়ল। — না। মৃতদের।

আমি লোকটার ইন্টারভিউ নিচ্ছিলাম। আমার একজন লোক দরকার, সেলসে। আমার বানানো জিনিস মানুষকে বুঝিয়ে বিক্রি করতে পারবে এমন কেউ। আমাদের কারখানায় এক ধরনের ট্রে বানানো হয়। কফিন সরানোর কাজে লাগে। এখানকার অনেক গোরস্থানে কবর মাটির নিচে হয় না। দেয়ালের ভেতর সারি সারি খোপে কফিন রাখা হয়। কফিনগুলো এত ভারি যে ভেতরে ঠেলে নিতে বেশ কষ্ট হয়। আমাদের ট্রেটা নিচে বসিয়ে দিলেই কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়। এই প্রডাক্ট আমরা বানাই।

আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম— আরে, অবাক তো আমার হওয়ার কথা। আপনি এখানে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন; অথচ যেভাবে উত্তর দিচ্ছেন, তাতে তো এখনই আপনাকে পাগল ভেবে পরের ক্যান্ডিডেটকে ডাকা উচিত।

লোকটা একটুও বিচলিত হলো না।

— জানি আপনি তা করবেন না।

— এত নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে?

— আপনার সম্পর্কে জেনে এসেছি। আপনি লেখক মানুষ। আমার কথা শুনে আপনার কৌতূহল জাগবেই। আপনার মনে হবে, পেদ্রো পারামোর একটা চরিত্র আপনার সামনে এসে বসেছে। সেই কৌতূহল থেকেই চাকরিটা আমাকে দেবেন। অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও।

আমি হেসে ফেললাম।

চুপ করে রইলাম কিছুক্ষণ। ভাবলাম, লোকটা যদি সত্যিই আমার মনটা পড়ে এসে থাকে, তাহলে ওকে চাকরি দেওয়াই উচিত। আবার যদি সবটাই হিসেব করে বলে থাকে, তাহলেও ওকে চাকরি দেওয়া উচিত। যে মানুষ একজন লেখকের কৌতূহলকে এত নিখুঁতভাবে ধরতে পারে, সে হয়তো জিনিসও বিক্রি করতে পারবে। আবার এটাও সত্যি, এমন মানুষ চাইলে আমার কারখানার ক্ষতিও করতে পারে।

ঠিক আছে। কবে থেকে শুরু করতে পারবেন? আমি বললাম।

সে মৃদু হাসল।

— এখানে সম্ভবত সোমবার থেকে শুক্রবার কাজ হয়, তাই না? আমি কিন্তু শুক্রবার বেলা বারোটার পর কাজ করতে পারব না।

— অ্যান্ডি, কেমন আছ?

— ভালো।

— কী খাচ্ছ?

— আপনি আগে বলেন, স্যার। আপনি কী খাচ্ছেন?

— আমি? বাসা থেকে সালাদ বানিয়ে এনেছি। সঙ্গে দুটো সিদ্ধ ডিম।

— এইটুকুই?

— হ্যাঁ। এই বয়সে এর বেশি আর সহ্য হয় না।

— আচ্ছা।

ওর সামনে বসে খেতে খেতে বললাম— তা প্রথম চার ঘণ্টা কেমন কাটল?

— দারুণ। কাজের জায়গাটা গুছিয়ে নিয়েছি। যে জিনিস যখন লাগবে, হাত বাড়ালেই পাব। কোনো ট্রে পাঠাতে হলে স্ক্রুগুলোও আলাদা করে পাশে রেখেছি। আপনি শুধু বলবেন, আমি পাঠিয়ে দেব।

— না, না। ওসব নিয়ে এখন ভাবতে হবে না। আজ শুধু চারপাশটা দেখো। সবার সঙ্গে পরিচিত হও। নিরাপত্তার নিয়মগুলো বলেছে?

— সব বলেছে। কারখানায় ঢোকার আগেই নিকল একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে দিয়েছে।

— নিকল খুব কাজের মেয়ে।

— হ্যাঁ।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ খেতে থাকলাম।

— তা বলো তো, এত বছর মৃতদের সঙ্গে কাটিয়ে আজ জীবিতদের সঙ্গে কাজ করতে কেমন লাগছে? আমি বললাম।

অ্যান্ডি হেসে ফেলল।

— সেটা কি এভাবে বলা যায়, স্যার?

— এই কুরি, কেমন চলছে?

কুরি তখন গোলাপের বাগানে পানি দিচ্ছিল। পাইপটা এক পাশে রেখে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে এল।

— ভালো, স্যার।

— আজকে কোনো সেরিমনি আছে?

— আছে। ঘণ্টা দুয়েক পরে।

— কার?

— একজন মহিলা।

— বয়স?

— জীবনটা অনেকটাই উপভোগ করে গেছেন।

— হ্যাঁ, তাই তো। আজ আবার শুক্রবারও। দিনটাও পবিত্র।

— কিন্তু উনি তো ক্যাথলিক। কুরি হেসে বলল।

অ্যান্ডি একটু চুপ করে থেকে বলল,

— মরে যাওয়ার পরও কি ধর্ম আলাদা থাকে?

অ্যান্ডি কুরির দিকে তাকিয়ে বলল, —স্যার, আপনি একটু ঘুরে দেখুন। আমি কুরির সঙ্গে একটু হাত লাগাই।

বলেই ও কুরির পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। আমি একা হাঁটতে শুরু করলাম। অ্যান্ডিকে পেছনে ফেলে সোজা এগোতেই সারি সারি ফলক। কোনোটাকেই এড়িয়ে বা পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। একটু হলেও থমকে দাঁড়াতে হয়। বেশিরভাগ ফলকেই শুধু নাম, জন্ম আর মৃত্যুর তারিখ।

Helen Morris
1932 – 2024

Daniel Brooks
1917 – 2024

Samuel Ortega
1948 – 1983

Margaret Lee
1956 – 2019

George Sullivan
1910 – 2017

একশো সাত বছর।

আকাশটা পরিষ্কার। ঘাসের ওপর রোদ পড়ে রংটা আরও গাঢ় হয়ে আছে। একঝাঁক গাঙচিল গোরস্থানের ওপর দিয়ে সোজা উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ দমকা বাতাস এসে ওদের এক পাশে ঠেলে দিল। আবার ডানা সামলে এগোতে চাইল, আবার বাতাস সরিয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত গোরস্থানের ওপর দিয়ে আর যাওয়া হলো না। দলটা বাঁক নিয়ে দূরে সরে গেল।

আমি বাঁ দিকে মোড় নিলাম। বিশাল এক ওকগাছের নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরও অনেকগুলো ফলক। গোরস্থানের একেবারে শেষ মাথায় হঠাৎ চোখে পড়ল ছোট্ট একটা কাঠের চেয়ার। সাধারণ চেয়ারের চেয়ে অনেক ছোট।

কৌতূহলবশত এগিয়ে গেলাম। চেয়ারটার সামনে অনাড়ম্বর একটা ফলক।

Lira
2006 – 2017

চেয়ারটার নিচে একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স। কার জিনিস, কেন রাখা, এসব কিছুই তখন মাথায় এল না। বাক্সটা হাতে তুলে নিলাম। কোনো তালা নেই। ঢাকনাটা খুলতেই ভেতরে একটা বই। Because of Winn-Dixie. বইটার পাশে একটা কালো কালির কলম। কলমটা দেখেই হাত থেমে গেল। এই কলমটাই ইন্টারভিউর দিন অ্যান্ডির বুকপকেটে দেখেছিলাম।

— স্যার…

ডাক শুনে চমকে উঠে পেছনে তাকালাম। অ্যান্ডি এসে দাঁড়িয়েছে। ওর চোখের কোনা চিকচিক করছে।

— বলো?

— না, মানে… আপনি পড়ছেন?

— হ্যাঁ। কেন, অ্যান্ডি?

— আপনিও পড়ছেন?

আমি তখন উঠে দাঁড়িয়েছি। অ্যান্ডিও ঘুরে দাঁড়াল। হাঁটতে শুরু করল। আমি ওর পেছনে পেছনে হাঁটছি।

— কী হলো? পড়বে না?

— না। আজকের মতো আপনি তো পড়লেন।

— এইটুকুই?

— এইটুকু পড়লেই হয়। বেশি লাগে না।

হাঁটতে হাঁটতে অ্যান্ডি সমাধিস্থলের অন্য কোনায় চলে গেল। ওখানেও একটা সমাধি, মাটি থেকে একটু উঁচু করে বাঁধানো। অ্যান্ডি সেখানে এসে একটু থমকে দাঁড়াল। তারপর আবার হাঁটা ধরল গাড়ির দিকে। আমি ওর পেছনে। ও যেখানে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তার নিচে ছড়িয়ে আছে কয়েক টুকরো ভাঙা কাঁচ।

বেলা এগারোটা বাজে। অ্যান্ডি তখনও তিন নম্বর সারির পরিচর্যা শেষ করতে পারেনি। মনে পড়ে, এই তো বছর দুয়েক আগেও এগারোটার মধ্যে সাঁইত্রিশটা সারিই শেষ হয়ে যেত। তারপর বিশাল ওকগাছটার নিচে, লিরার পাশে গিয়ে বসত।

এখন ঘুম ভাঙার পর বিছানা থেকে নামতেই ইচ্ছে করে না। উঠে বসে চপ্পল খুঁজে পায় না। চপ্পল খুঁজে পেলেও পা ঢোকাতে সময় লাগে। বাথরুমে গিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সময় কাটিয়ে ফেলে। গোরস্থানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায়ই দেখে মালিক অফিসে এসে বসে আছেন। আগে কখনো এমন হতো না। অ্যান্ডিই সবসময় আগে আসত।

ও দ্রুত কাজে হাত লাগায়। বেলা দুটোর সময় একজন সৈনিক আসবে। সদ্য প্যালেস্তাইন থেকে ফিরেছে। আজ ওর শেষ বিদায়। সারাটা গোরস্থান তার জন্যই তৈরি হচ্ছে। আমেরিকান পতাকাটা এসে গেছে। সামরিক পোশাকে কয়েকজন সৈনিকও আসবে। কফিনের ওপর পতাকাটা মেলে দেওয়া হবে। শেষে তিন দফা রাইফেলের গুলি ছোড়া হবে, বাজবে ট্যাপস। পতাকাটা ভাঁজ করে তুলে দেওয়া হবে পরিবারের হাতে। ছেলেটার বয়স মাত্র ২২ বছর তিন মাস ১ দিন।

অ্যান্ডির হাতে সময় নেই। ও দ্রুত কাজ করে যাচ্ছে।

এটা এখানে থাকার কথা, ওখানে গেল কী করে, কালই তো নিজের হাতে এখানে রেখে গিয়েছিলাম, পতাকাটাও তো এদিকে মুখ করে ছিল, কে ঘুরিয়ে দিল, মাছ ধরার ছিপটা এখানে কেন, ওটা তো ওই পাশেই ছিল, গাড়িটা এত দূরে গেল কী করে, চশমাটা ভাঁজ করা ছিল, এখন একটা ডাঁটি পুরো খোলা, এত শক্ত ডাঁটি নিজে নিজে খুলবে কী করে, বেসবলটা এখানে ঢুকল কী করে, এখানে তো জায়গাই নেই, রাখতে হলে গ্লাভসটা ভাঁজ করতে হয়, টেডি বিয়ারটাও উল্টো হয়ে আছে, কাল তো মুখটা এদিকে ছিল, সানগ্লাসের একটা কাচ আবার ভাঙল কী করে, আরে, এই ছবিটা তো মিসেস গ্ল্যাডিসের কাছে ছিল, হ্যারির কাছে এল কী করে, আর ক্রুশটা, ক্রুশটা তো হ্যারির কাছে ছিল, এখন মিসেস গ্ল্যাডিসের কাছে কেন?

অ্যান্ডি ছবিটা তুলে আবার গ্ল্যাডিসের পাশে রাখল। ক্রুশটা নিয়ে গেল হ্যারির কাছে।

কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

কাজ প্রায় শেষ। অ্যান্ডি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছে দ্রুত শেষ সারিটার দিকে এগিয়ে গেল। ঘাম চোখে ঢুকে জ্বালা করছে। চোখ খুলতে পারছে না। কয়েকবার পিটপিট করল। হাতটা নামাতে গিয়েই ধাক্কা লাগল ছোট্ট কাচের গোলকটায়।

মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল।

ভেতরের পানি ছড়িয়ে পড়ল ঘাসে। কাঁচের টুকরোর মাঝখানে পড়ে আছে ভ্যালেন্সিয়ার সিটি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের ছোট্ট প্রতিকৃতিটা।

অ্যান্ডি তাকিয়ে রইল।

গত বছর ভ্যালেন্সিয়া থেকে ও নিজেই কিনে এনেছিল।

আস্তে করে নিচু হয়ে কাঁচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিল। ছোট্ট প্রতিকৃতিটা তুলে বাঁধানো সমাধিটার ওপর রেখে দিল। 

তারিখ: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ইং
সূত্র: দৈনিক সংবাদ, সংবাদ সাময়িকী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *