হাইতি ও ফিফা: ঔপনিবেশিকরা হারিয়ে যায়নি | আনিসুজ জামান

হাইতি ও ফিফা: ঔপনিবেশিকরা হারিয়ে যায়নি | আনিসুজ জামান

আগামীকাল হাইতি প্রথমবার বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে নামবে। কিন্তু বল মাঠে গড়ানোর আগেই এমন এক বিতর্ক শুরু হয়েছে, যা মাঠের জয়পরাজয় ছাপিয়ে বর্তমান সময়টাকে আরো ভালো করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে।

বিতর্কটি একটি জার্সিকে ঘিরে। কোনো বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন নয়। কোনো নির্বাচনী প্রচারণা নয়। কোনো রাজনৈতিক স্লোগানও নয়। ভার্তিয়েরের যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু প্রতীক নিয়ে তৈরি হয়েছে ঝামেলাটা। ভার্তিয়ের যুদ্ধ ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির পরাজয় ঘটিয়ে হাইতির স্বাধীনতার পথ খুলে দিয়েছিল। এই বিতর্কের খবরটি পড়তে পড়তে আমার মনে পড়ে গেল বহু বছর আগে পড়া একটি কথা। ১৯৯৯ সালে আর্জেন্টিনার সাহিত্যপত্রিকা এল মুরমুয়‍্যো-তে প্রকাশিত সিম্পসনের সঙ্গে হুয়ান রুলফোর একটি কথোপকথন প্রকাশিত হয়। যতদূর মনে পড়ে, রুলফো বলেছিলেন—পুরনো ঔপনিবেশিকরা এখনও আমাদের ভেতরে বসবাস করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁর কথাটা আরো ভালো করে অনুধাবন করেছি। ‘পেদ্রো পারামো’ উপন্যাসে মৃতরা কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। তারা অতীত থেকে কথা বলে যায়। হয়তো ঔপনিবেশিক শক্তির ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে। আমরা মনে করি, সেটি বহু আগে মাটিচাপা পড়েছে। কিন্তু মাটিচাপার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না। অন্য রূপে ফিরে ফিরে আসে।

কিছুদিন আগে এক বন্ধুর কাছে একটি গল্প শুনে আবার সেই কথা মনে পড়ল। সে আমাকে এক হাইতিয়ান নারীর কথা বলেছিল। ভদ্রমহিলা একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন। একদিন পুলিশ সেখানে মাদক খুঁজে পায়। তিনি মালিক ছিলেন না। তিনি বারবার বলছিলেন, সেই গোপন আস্তানার কথা তিনি জানতেনই না। মাদক যেখানে পাওয়া গিয়েছিল, সেটি তাঁর কাজের জায়গাতেও ছিল না। তবু শেষ পর্যন্ত তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল।

আমি মামলার নথি জানি না। প্রমাণও দেখিনি। আমার মধ্যে শুধু ঐ অনুভূতিটা জাগিয়ে তুলেছিল। আমি হাইতির কথা ভেবেছিলাম। ক্ষমতা কাঠামোর কথা ভেবেছিলাম। কাদের সহজে সন্দেহ করা হয় আর কাদের সন্দেহের ঊর্ধ্বে ধরা হয়, সেই প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছিল। হয়তো এ কারণেই ঘটনাটি আমার কাছে এত পরিচিত মনে হয়েছিল। বহু বছর ধরে আমি নানা সীমান্ত, বিমানবন্দর ও অভিবাসন চৌকি পার হয়েছি। অসংখ্যবার দেখেছি, অন্যরা কোনো প্রশ্ন ছাড়া চলে যাচ্ছে, আর আমাকে থামিয়ে কাগজপত্র দেখাতে হচ্ছে, ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে।

আমি আপত্তি জানালে ওদের উত্তর একটাই:“এটা রানডম সিলেকশন, স্যার।”

হয়তো তাই। কিন্তু বহু বছর পর মানুষ নিজেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করে—কেন সেই রানডম ডাউট বারবার একই ধরনের মানুষের ওপর এসে পড়ে?

Collect all books written by Anisuz Zaman 

সেই চক্রে আটকে গেল হাইতির নাম। এবার ফুটবলের মতো জনপ্রিয় বিশ্বআসরে। হাইতির জাতীয় দল তাদের জার্সিতে ভার্তিয়ের যুদ্ধের স্মারক হিসেবে কিছু প্রতীক রাখতে চেয়েছিল। হাইতির বাইরে আমাদের অনেকের কাছে এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার নাম। কিন্তু হাইতিয়ানদের কাছে তাদের জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের জাতিগত পরিচিতি নির্মাণের অপরিহার্য ভিত্তি। আর সমস্যাটা সেখানেই। হাইতির জন্ম কোনো সাম্রাজ্যের দয়ায় হয়নি। হাইতির জন্ম হয়েছে কারণ দাসেরা একটি সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য এক ইতিহাস। সাদাদের জন্য অস্বস্তিকর ইতিহাসও বটে।

সাম্রাজ্যগুলো সাধারণত নিজেদের বিজয় উদ্‌যাপন করতে ভালোবাসে। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো তাদের যুদ্ধ, তাদের বীর এবং তাদের জাতীয় প্রতীক নিয়ে গর্ব করে। কিন্তু হাইতি যখন একটি ঔপনিবেশিক শক্তির পরাজয় স্মরণ করতে চায়, তখন হঠাৎ করেই আপত্তি। সেটা করা যাবে না। জার্সির ওই প্রতীকগুলো পরিবর্তন মুছে ফেলতে হবে। অন্য কোনো “নির্দোষ” প্রতীক বসাতে হবে। কোন উদ্দেশ্যে এটা বলা হচ্ছে জানি না। জানার উপায়ও নেই। কিন্তু আমি যা দেখে আসছি এতটা বছর তার নিরিখে বলতে পারি। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও হাইতির বিপ্লবের স্মৃতি এখনও অস্বস্তি সৃষ্টি করছে ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে। এখনও এমন কিছু ইতিহাস আছে যেগুলো মনে রাখতে সবাই আগ্রহী। আবার এমন কিছু ইতিহাস আছে যেগুলো ভুলে যেতে পারলেই অনেকে স্বস্তি পায়। শুধু ভুলে যেতে না, ভুলিয়ে দিতেও চেষ্টা করে তারা। বিজয়ীদের স্মৃতির তুলনায় মুক্তিপ্রাপ্তদের স্মৃতিকে পৃথিবী এখনও অনেক বেশি অস্বস্তির চোখে দেখে। তাই আমাকে আবার রুলফোর কাছে ফিরে যেতে হলো। হয়তো পুরনো ঔপনিবেশিকরা হারিয়ে যায়নি। হয়তো তারা শুধু অন্য ভাষায় কথা বলতে শিখেছে—বিধিবিধানের ভাষায়, প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায়, আপাতভাবে নিরপেক্ষ বলে মনে হবে, এমন ‘স্বীকৃত’ ভাষায়।

তারা আর জাহাজে করে আসে না। তারা আর বর্ম পরে না। তারা নিজেদের বিজেতা বলে পরিচয়ও দেয় না। কিন্তু কোনো পুরনো মুক্তির ইতিহাস যখন আবার স্মরণ করা হয়, তখন তাদের উপস্থিতি হঠাৎ করে অনুভব করা যায়। আগামীকাল হাইতি ফুটবল নিয়ে মাঠে নামবে আমেরিকার মাটিতে। কিন্তু তাদের জার্সিকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কিছু যুদ্ধ কখনো সত্যিকার অর্থে শেষ হয় না। ঔপনিবেশিকরা হারিয়ে যায়নি। তারা শুধু আরও মার্জিত মুখোশ পরতে শিখেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *