
শহীদুল জহির ও জাদুবাস্তবতা: এক ভুল পাঠের বিশ্লেষণ | আনিসুজ জামান
শহীদুল জহির বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্বতন্ত্র কথাসাহিত্যিক। তিনি অন্যদের থেকে আলাদা হয়েছেন তাঁর নিজস্ব ন্যারেটিভ শৈলির কারণে। বাংলা সাহিত্যে আগে-পরে তাঁর মতো গল্প বলার স্বর আমরা পাইনি। বাংলা কথাসাহিত্যের ঐতিহ্যগত নির্মাণশৈলী তিনি ভেঙে ফেলেছেন। এই কারণে আখ্যানতত্ত্বের আলোকে নানাভাবে তাঁর লেখাকে ব্যাখ্যা করা যায়। তাঁর গল্প-উপন্যাসে লোকজ উপাদান, মিথ তৈরির প্রবণতা, পরাবাস্তবতা, কাঠামোহীনতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। কিন্তু তাঁকে আলোচনার ক্ষেত্রে সব সময় সামনে আনা হয় জাদুবাস্তববাদের বিষয়টি। অথচ দেখা যাচ্ছে, জাদুবাস্তবতার মৃদু লক্ষণ কোথাও কোথাও থাকলেও তিনি জাদুবাস্তববাদী লেখক নন। মুশকিল হলো, শহীদুল জহির নিজেই তাঁর একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি জেনেবুঝে জাদুবাস্তবতার বিষয়টি অনুসরণ করেছেন। তিনি বলছেন, ‘জাদুবাস্তবতার ব্যাপারটা তো আমি মার্কেসের কাছ থেকে পেয়েছি। এবং এটা আমি গ্রহণ করেছি দুটো কারণে। প্রথমত, চিন্তার বা কল্পনার গ্রহণযোগ্যতার যে পরিধি সেটা অনেক বিস্তৃত হতে পারে বলে আমি মনে করি।…দ্বিতীয়ত, আমি আসলে বর্ণনায় টাইমফ্রেমটাকে ভাঙতে চাচ্ছিলাম…। [সাক্ষাৎকার, আহমাদ মোস্তফা কামাল গৃহীত]।
তাঁর এই কথার সূত্র ধরে এবং জাদুবাস্তববাদ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকার কারণেও হতে পারে অনেক সমালোচক বাংলা সাহিত্যে জাদুবাস্তব ঘরানার লেখক বলতে শহীদুল জহিরকে চিহ্নিত করেন। আমি সেটাই বোঝার চেষ্টা করেছি বর্তমান গদ্যে।
জাদুবাস্তববাদ বিংশ শতকের লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আলেহো কার্পেন্তিয়ের জাদুবাস্তববাদের প্রথম তাত্ত্বিকই শুধু নন, তিনি তাঁর উপন্যাসে প্রথম জাদুবাস্তববাদের সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়ে দেখান। ‘এ জগতের রাজত্ব’ নামে উপন্যাসটি আমার অনুবাদে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। কার্পেন্তিয়ের ছাড়াও হুয়ান রুলফো থেকে শুরু করে মার্কেস পর্যন্ত অনেক লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের মায়েস্ত্রো জাদুবাস্তববাদী সাহিত্যের পুরোধা লেখক হিসেবে গণ্য।
জাদুবাস্তববাদ কি সেটা বুঝতে হলে আমাদের মাথায় রাখতে হবে, এটা বাইরের কোনো আরোপিত বিষয় না। জাদুবাস্তবতা মানে কেবল গল্পে অচেনা বা অদ্ভুত উপাদান ঢুকে পড়াও নয়। আলেহো কার্পেন্তিয়ের হাইতির সমাজ-বাস্তবতা থেকে পান ’lo real maravilloso’ (এ জগতের রাজত্ব) উপন্যাসের ধারণাটি। কার্পেন্তিয়ের লক্ষ্য করেছিলেন যে, ইউরোপে বারোকো মানে অতিরঞ্জন ও কৃত্রিমতা, অথচ লাতিন আমেরিকায় সেই একই অতিরঞ্জন ছিল বাস্তবতার অংশ। অন্তহীন অরণ্য, বিশাল পাহাড়, অকল্পনীয় বিপ্লব, আর বিশ্বাসের শক্তিতে জীবন বদলে ফেলা এই জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা ইউরোপীয় নিরেট বাস্তবতা না। লাতিন আমেরিকার যাপিত বাস্তবতা ও উপলব্ধি থেকেই জাদুবাস্তবতার বিষয়টি গড়ে ওঠে। এই বর্ণনাশৈলীতে দৈনন্দিন ঘটনা এমনভাবে বলা হয় যে তা অসাধারণ মনে হয়, কিন্তু সবসময় একটি জাতিগত বিশ্বাসযোগ্যতার ভেতরে থাকে। তাই, যখন El reino de este mundo (এ জগতের রাজত্ব)–তে ম্যাকান্দালকে সবাই পশুতে রূপান্তরিত হতে বিশ্বাস করে, অথবা যখন Cien años de soledad (নিঃসঙ্গতার একশ বছর)–এ রেমেদিওস দে বেলা কাপড় শুকাতে শুকাতে আকাশে উড়ে যায়, তখন সেটি কল্পকাহিনি নয়, কথকের খেয়ালী আবিষ্কারও নয়; বরং এমন এক বর্ণনাভঙ্গি যেখানে জাতিগত স্মৃতি ও চেতনা অলৌকিক ঘটনাকেও জীবনের বাস্তব ঘটনা হিসেবে মেনে নেয়।
জাদুবাস্তবতার মূল বিষয়টি নিহিত রয়েছে সাধারণকে অসাধারণ করে তোলার ক্ষমতায়। এখানে কল্পিত কোনো জগত তৈরি করা হয় না, বরং দৈনন্দিন ঘটনাকেই এমন ভঙ্গিতে বর্ণনা করা হয় যে তা আশ্চর্য ও অলৌকিক মনে হয়। রান্নাঘর, বাজার, গৃহস্থালি জীবন কিংবা কৃষিকাজ—এসব পরিচিত পরিবেশই হয়ে ওঠে সেই মঞ্চ যেখানে অসম্ভব কোনো ঘটনা ঘটে যায়, অথচ বাস্তবতার লজিক এবং শৃঙ্খলা এতোটুকু প্রশ্নবিদ্ধ হয় না।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাসযোগ্যতা। বিশ্বাসযোগ্যতা হতে হবে সমষ্টিগত, ব্যক্তিগত নয়। অলৌকিক ঘটনা তখনই জাদুবাস্তব হয়ে ওঠে যখন তা কোনো একক চরিত্রের কল্পনায় সীমাবদ্ধ না থেকে গল্পের সমষ্টিগত চেতনা দ্বারা গৃহীত হয়। যেমন, রেমেদিওস দে বেলার আকাশে উড়ে যাওয়া দেখে বুয়েন্দিয়া পরিবার বিস্মিত হয় না, কিংবা হাইতির দাসেরা ম্যাকান্দালের রূপান্তর নিয়ে সন্দিহান হয় না। এই সম্মিলিত স্বীকৃতিই জাদুবাস্তবতাকে ফ্যান্টাসি বা স্যুররিয়ালিজম থেকে পৃথক করে তোলে: এখানে অসম্ভবও বাস্তবের অংশ হয়ে যায়, কারণ সেটি সকলে বিশ্বাস করে।
‘এ জগতের রাজত্ব’ উপন্যাসে আলেহো কার্পেন্তিয়ের জাদুবাস্তবতার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন উদাহরণগুলো উপস্থাপন করেছেন। মাকান্দালের দাস অগ্নিকুণ্ড থেকে পালিয়ে যেতে পারে। কারণ সবাই বিশ্বাস করে সে পশুর রূপ ধারণ করতে সক্ষম। সমগ্র সমাজের স্বীকৃতির ফলে সেই রূপান্তর আখ্যানের ভেতরে বাস্তব ঘটনায় পরিণত হয়। একইভাবে, তি নোয়েল তার জীবনের শেষ প্রান্তে হাঁস বা অন্যান্য প্রাণীর রূপ ধারণ করার ক্ষমতা অর্জন করে, গাছের মগডালে উঠে মানুষের জীবনকে উপর থেকে পর্যবেক্ষণ করে। এখানে অলৌকিকতা জন্ম নেয় আফ্রিকার লোকায়ত বিশ্বাস থেকে, লেখকের কৃত্রিম উদ্ভাবন থেকে নয়। আর এই যে দাসদের বিপ্লব, যে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে হাইতি থেকে ইউরোপীয়রা বিতাড়িত হয়, সেটা ঐতিহাসিক ঘটনা হলেও অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়—মানব ইতিহাসে সেই প্রথমবারের মতো দাসেরা প্রভুদের সিংহাসনে বসেছিল। কিন্তু এই ঘটনা তো সত্যি সত্যিই ঘটেছিল। কার্পেন্তিয়ের যখন বর্ণনা করেন, তখন তা অসাধারণ মহিমায় উদ্ভাসিত হয়। এই সব ক্ষেত্রে জাদুবাস্তবতা জন্ম নেয় দৈনন্দিন জীবন ও সমষ্টিগত বিশ্বাস থেকে। তা থেকে আমরা অনুধাবন করি, কীভাবে একটি সম্প্রদায়ের আস্থা অসম্ভবকেও বাস্তবে রূপান্তরিত করতে পারে।
কার্পেন্তিয়ের জাদুবাস্তববাদের ‘lo real maravilloso’-র তাত্ত্বিক ও বর্ণনামূলক ভিত্তি দিয়েছিলেন, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস সেটিকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এক সাহিত্যিক অনুশীলনে পরিণত করেন। ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। তবে দুটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমটি হলো রেমেদিওস দে বেলার আকাশে উঠে যাওয়ার ঘটনাটি। যখন সে কাপড় শুকাচ্ছিল, একেবারেই দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজের মধ্যে অতিপ্রাকৃত ঘটনা মিশে গেল, আর পরিবার ও গ্রামবাসী তা কোনো বিস্ময় ছাড়াই মেনে নিল, যেন এটি অতি স্বাভাবিক একটি ঘটনা। দ্বিতীয়টি হলো আর্কাদিওর রক্ত প্রবাহিত হওয়ার ঘটনাটি। তার রক্ত রাস্তা ধরে মানুষের চলার মতো করে একেবেঁকে উঁচুনিচু পথ পাড়ি দিয়ে সরাসরি সেই রান্নাঘরে পৌঁছায় যেখানে উরসুলা কেক বানানোর জন্য ডিম প্রস্তুত করছিল। রক্তের এমন দূরত্ব এবং পথ অতিক্রম করা অসম্ভব। কিন্তু এর পেছনে আছে এক সাংস্কৃতিক যুক্তি। এটা যদি আমি বাংলাদেশের ঐতিহ্য অনুসরণ করে লিখতাম তাহলে হয়তো বলতাম রক্তের টানে মায়ের মনে কু ডেকেছে। মায়ের শরীর হঠাৎ কিছু অনুভব করে, ফলে নিজের অন্তর্দৃষ্টি থেকে ছুটে যায় ছেলের কাছে। মার্কেসের আখ্যানে সেই মাতৃত্বের ডাক রূপ নিয়েছে এক দৃশ্যমান রক্তস্রোতের, যা সবাই দেখতে পায়। অলৌকিকতা এখানে জন্ম নেয় বাস্তব মানবিক অনুভূতি থেকে, যা সমাজ স্বীকার করে। জাদুবাস্তবতার দুটি মৌলিক নীতি পূর্ণ হয় এক্ষেত্রে: সাধারণ ঘটনাকে অসাধারণ করে তোলা এবং সমষ্টিগত বিশ্বাসযোগ্যতা।
যখন এই নীতিগুলোকে শহীদুল জহিরের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি নিজেকে জাদুবাস্তবতার চর্চাকারী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলেও তাত্ত্বিকভাবে সেটি প্রমাণিত হয় না। তাঁর গল্পে এমন অনেক ঘটনা আছে যা অতিরঞ্জিত—যেমন: কাঠুরে আকালু ও তার স্ত্রী টেপির কাকের ডিম খেয়ে বেঁচে থাকা—সাধারণকে অসাধারণ করে তোলার ঘটনাও চোখে পড়ে—যেমন: আকালু ও টেপিকে কাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য—কিন্তু এই ঘটনাগুলি সমষ্টিগত বিশ্বাসের অংশ হয় না। বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গাতে এসে সেগুলি ফ্যান্টাসি বা মিথিক অথবা কোথাও কোথাও পরাবাস্তবতার মতো মনে হয়। তাঁর আখ্যানগুলো প্রায়শই রহস্যময় আবহে স্থাপিত হয়, প্রতীকধর্মী উপাদানে ভরপুর, এবং কখনো কখনো রূপকধর্মী আবহের কাছাকাছি চলে যায়। রান্নাঘর, বাজার কিংবা যৌথ আচার-অনুষ্ঠান থেকে শুরু না করে, শহীদুল জহির সাধারণত ভাঙাচোরা নগরজগত নির্মাণ করেন, যেখানে বিস্ময়কর বা অস্বাভাবিকতার জন্ম হয় ভাষার ঘন কাব্যিকতায়, দৈনন্দিন জীবনে অলৌকিকতার অন্তর্ভুক্তি থেকে নয়। এই গল্পের সঙ্গে মার্কেসের বিখ্যাত গল্প ‘প্রকাণ্ড ডানাঅলা এক অশীতিপর বৃদ্ধ’-এর তুলনা করলে পার্থক্যটা আরো স্পষ্ট হতে পারে। সাধারণকে অসাধারণ করে দেখানো বা অসাধারণকে সাধারণ করে দেখানো এবং সাধারণকে ফ্যান্টাসি ও রূপকথার অংশ করে তোলা—দুটো আলাদা বিষয়। মারকেসের গল্পে এক অসাধারণ (এক্সট্রাঅর্ডিনারি) চরিত্রকে পাই যার দুটো ডানা আছে। কিন্তু তার ট্রিটমেন্ট একবারেই সাধারণ। লোকজন নিজেদের জীবনের অংশ হিসেবেই তাকে নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করে। এই ডানাঅলা বৃদ্ধকে তারা কোনো ঐশ্বরিক বা অলৌকিক ঘটনা হিসেবে দেখে না। কিন্তু শহীদুল জহিরের কাক ফেবলের মত কথা বলে, ইচ্চাশক্তি নিয়ে কাজ করে, কাঠুরিয়ার জীবনে হস্তক্ষেপ করে। অসাধারণ এই উপাদান আখ্যানের স্বরে সাধারণ না হয়ে ফ্যান্টাসি ও ফেবল হয়ে ওঠে। ফলে এটা হয়ে যায় এলিগরি। মার্কেস যেখানে অতিবাস্তবকে বাস্তব করেন। শহীদুল জহির সেখানে বাস্তবকে অতিবাস্তব করেন। অর্থাৎ মার্কেস অলৌকিক ঘটনাকে লৌকিক করে তোলেন, অন্যদিকে শহীদুল জহির তাঁকে রূপক করে তোলেন।
এই কারণে শহীদুল জহিরের লেখায় অস্বাভাবিক বা অব্যাখ্যাত উপাদান থাকলেও সেগুলো বাস্তবতার অংশ হয় না। সমষ্টিগত চেতনার অংশ হয় না। কারণ শহীদুল জহির সৃজনশীল প্রতিভা থেকে সেগুলি সৃষ্টি করেন, যাপিত জীবন থেকে নয়। এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি। এই কারণেই স্পষ্ট হয়, শহীদুল নিজের মতো সাহিত্যের একটা জনরা সৃষ্টি করেছেন, যা অবশ্যই মহত লেখকের লক্ষণ, কিন্তু তিনি জাদুবাস্তবতার ঐতিহ্যের অনুসারী লেখক নন।
শহীদুল জহিরের সবচেয়ে আলোচিত সৃষ্টিগুলোর একটি হলো ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’। এই উপন্যাসে ঢাকার এক অন্ধকারাচ্ছন্ন রূপ উঠে এসেছে—রাজনৈতিক টানাপোড়েন, দমন-পীড়ন আর অস্থিরতায় ভরা এক শহর। অনেক সমালোচক এখানে কিছু অস্বাভাবিক দৃশ্যকে জাদুবাস্তবতার উদাহরণ হিসেবে পাঠ করতে চেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে সেখানে অলৌকিক ঘটনার কোনো দৈনন্দিন রূপান্তর নেই; বরং ভাষা ও উপমার মাধ্যমে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন: চরিত্ররা অনুভব করে যে শহরটা যেন নিজেই শ্বাস নিচ্ছে, কিংবা ভবনের ছায়া তাদের তাড়া করছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এগুলো সমাজের স্বীকৃত কোনো সত্য নয়, বরং প্রতীকী কৌশল, যা দমন আর বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিকে বাড়িয়ে তোলে। লাতিন আমেরিকান জাদুবাস্তবতায় যেখানে একটি সমাজ মেনে নেয় যে একটি নারী আকাশে উঠে গেছে বা এক দাস পশুর রূপ নিয়েছে, সেখানে জহিরের অস্বাভাবিক দৃশ্যগুলো থাকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভেতর, নিছক প্রতীকের স্তরে। তাই তাঁর নান্দনিকতা যতই শক্তিশালী ও মৌলিক হোক, সেটি জাদুবাস্তবতার উপকরণ হয়ে ওঠে না।
আবার একটি গল্পে দেখা যায়: নায়ক দেখছে পুকুরের মাছগুলো নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, যেন প্রকৃতি নিজেই কোনো গোপন বার্তা জানাতে চাচ্ছে। এই দৃশ্যটির কাব্যিক শক্তি আছে, কিন্তু এটি সমাজের দ্বারা স্বীকৃত কোনো ঘটনা নয়, কিংবা কোনো যৌথদৃষ্টির অংশও নয়। বরং এটি একান্ত ব্যক্তিগত, বিষয়গত অভিজ্ঞতা, যা চরিত্রটিকে একটি সম্মিলিত কল্পনার বদলে তার নিঃসঙ্গতাকেই জোরালো করে তোলে। জাদুবাস্তবতায় যেখানে অলৌকিকতা সামাজিকভাবে বৈধতা পায় কারণ সবাই সেটি বিশ্বাস করে, এখানে অস্বাভাবিক দৃশ্যটি থেকে যায় নিছক রূপকের স্তরে: এটি কথকের বা নায়কের চেতনার প্রতিফলন, কোনো সমাজের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবতা নয়।
কিন্তু কারপেন্তিয়েরের ‘এ জগতের রাজত্ব’ উপন্যাসে ম্যাকান্দালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও দাসেরা বিশ্বাস করেছিল যে সে পশুর রূপ নিয়েছে, আর সেই বিশ্বাসই তাকে বাঁচিয়ে রাখল স্মৃতিতে। তি নোয়েল, বার্ধক্যে ও বিভ্রমে আক্রান্ত, নিজে হাঁসে রূপান্তরিত হয়েছে ভেবে গাছের মগডালে উঠে যায়। আফ্রিকান দৃষ্টিভঙ্গি এটিকে সত্যি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যেমন, আমি সম্প্রতি তানজেনিয়া ভ্রমণে মাসাইদের কাছ থেকে শুনেছি—তারা বিশ্বাস করে যে জাদুর মাধ্যমে শিকারি সিংহের মুখ থেকে গরুকে রক্ষা করা যায়। হাইতিতেও তাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না ম্যাকান্দাল সত্যিই রূপান্তরিত হয়েছে কি না; গুরুত্বপূর্ণ যে সবাই সেটা বিশ্বাস করেছে।
আবার গার্সিয়া মার্কেস যখন রেমেদিওস দে বেলাকে বর্ণনা করেন, তখন তাকে দেখান এমন এক নারী হিসেবে, যার সৌন্দর্য সমাজের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। যখন লম্বা চুল ছিল, চুল দেখে পুরুষেরা উত্তেজিত হতো, ন্যাড়া করার পর চুলবিহীন মাথা দেখে আরো বেশি উত্তেজিত হয়। যখন হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘নন্দিত নরক’র রাবেয়ার মতো রেমেদিওস নিচে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে আলখাল্লার মতো কাপড় পরে থাকে। মানুষ তখনো উত্তেজিত হয়। নন্দিত নরকে অন্তঃসত্তা হয় কুমারি রাবেয়া। তাতে তার যে পরিণতি হয় রেমেদিওসেরও একই পরিণতি হয়। প্রভাবশালী পরিবারের লোকেরা সমাজের কাছে রটিয়ে বেড়ায় যে রেমেদিওস চাদরে করে উপরে চলে গেছে। আখ্যানে উল্লেখ আছে: একদিন কাপড় শুকানোর সময় সে আকাশে উঠে গেল। কিন্তু এই অলৌকিক ঘটনার পেছনে পড়া যায় এক অব্যক্ত সত্য, পরিবার তখন সমাজকে বোঝানোর জন্য গল্প বানায়—সে যিশু খ্রিস্টের মতো আকাশে উঠে গেছে। আর যদি খ্রিস্টে বিশ্বাস করা যায়, তবে রেমেদিওসের উত্থানেও বিশ্বাস করা যায়। পুরো সমাজ সত্য হিসেবে মেনে নিতে পারে এই ব্যাখ্যাটা। এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, রাবেয়ার চরিত্রটি কিভাবে এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হলো। আমি মনে করি একই চরিত্রের বাস্তববাদী এবং জাদুবাস্তববাদী ট্রিটমেন্ট বোঝার জন্য এই দুটি চরিত্র তুল্য পাঠ করা যেতে পারে। দুই মহাদেশের দুই লেখক তাদের নিজস্ব সমাজ বাস্তবতা তুলে ধরে রাবেয়া ও রেমেদিওসের মতো দুটি সরল সহজ চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। তাদের সরলতাকে উন্মাদ সাব্যস্ত করে করেছে সমাজ। তারা নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং দুজনের পরিণতি প্রায় একই রকম হয়েছে। অর্থাৎ তাদের সামাজিক বাস্তবতা প্রায় এক। কিন্তু পার্থক্য করে দিয়েছে ট্রিটমেন্টে। হুমায়ুন আহমেদ বাস্তববাদী থেকেছেন এবং মার্কেস জাদুবাস্তবতার আশ্রয় নিয়েছেন।
শহীদুল জহিরকে নিয়ে আলোচনা করার অসুবিধা হলো তিনি অলরেডি বাংলা একাডেমিয়া জাদুবাস্তববাদী লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর সাহিত্যকে জাদুবাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে অনেক প্রবন্ধ রচিত হয়েছে। আমি কিছু পড়ার চেষ্টা করে দেখেছি, অধিকাংশ প্রবন্ধে জাদুবাস্তবতার সংজ্ঞা পরিস্কার করা হয়নি। জাদুবাস্তবতার যে আপাত ধারণাকে ভিত্তি করে আলোচনা করা হয়েছে তাতে মনে হয়েছে সেই ধারণার মধ্যেই সমস্যা আছে। ইউরোপীয় শিল্পীরা বারকের আদলে গদ্যসাহিত্যে যে অতিরঞ্জন ও কৃত্তিমতা সৃষ্টি করেন তা অনেকে জাদুবাস্তব বলে মনে করেন। আমাদের পরিস্কার হওয়া দরকার, জাদুবাস্তবতা ইউরোপীয় সংস্কৃতির অংশ নয়। ওখানে যেটা হয় সেটা মস্তিষ্ক সৃজিত, কার্পেন্তিয়ের সেভাবেই বলতে চান। এবং স্যু-রিয়ালিজম, ফ্যান্টাসি ও ফেবল ইত্যাদির ব্যবহার ইউরোপীয় সাহিত্যে ব্যাপকভাবে ঘটেছে, যেটা জাদুবাস্তব বলে বোঝাতে চেয়েছেন বাংলা ভাষার অনেক আলোচক। যে কারণে জাদুবাস্তব সংক্রান্ত অধিকাংশ বাংলা প্রবন্ধ পড়ে বিভ্রান্ত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে।
একজন আলোচন যেমন শহীদুল জহিরের জাদুবাস্তবতা বোঝাতে লিখেছেন: ‘আমাদের বকুল’ গল্পে একজন সমালোচক “ফাতেমার দুই অবুঝ সন্তানকে সান্তবনা জ্ঞাপনে গ্রামের বৃদ্ধ ইমাম মোহসিন আলির রোপিত বিচিকলার চারাটি যখন বর্ষায় পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়, তখন গাছের সুগোল ও স্ফীত গুঁড়ি, সুগঠিত ও সতেজ পত্রপলস্নবের বিসত্মারের দৃশ্য তাদের অবচেতনলোকে বারবার পুনরুদ্রেক ঘটায় ফাতেমার যৌবনদীপ্ত দেহবলস্নরীর অনিন্দ্য স্মৃতি। নারী ও প্রকৃতির অভিন্নতা রূপায়ণে লেখক গ্রামবাসীর সমষ্টিচেতনায় পুঞ্জীভূত স্মৃতিচারণার মাধ্যমে জাদুবাস্তবতাকে ভাষ্যরূপ দিয়েছেন। এর ক্রমবিসত্মার ঘটেছে দীর্ঘদিনের ব্যবধানে ফাতেমার উদ্ভিন্নযৌবনা তরুণী কন্যা বকুলের নারীত্বের প্রথম ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার সমান্তরালে তার সঙ্গে সেই গাছটির দেহসুষমাগত সাদৃশ্য আবিষ্কারের ঘটনায়। এভাবেই ফাতেমা, তার মেয়ে বকুল ও তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে রোপিত কলাগাছের আপাত যোগসাযুজ্যে গ্রামবাসীর চেতনায় নারীর স্বতন্ত্র অসিত্মত্ব স্বীকৃত হলেও তা যে নিতান্তই আপেক্ষিক, বিষয়টিকে লেখক নির্দেশ করেছেন লাল পিঁপড়ার ঝাঁকের আক্রমণে বকুলের মৃত্যুর ঘটনায়। হয়তো এ-ঘটনা গল্পের সচেতন পাঠকের কাছে যতটা বিস্ময়কর, ততটা যুক্তিনিষ্ঠ বিবেচিত হয় না।“ বলে এটাকে জাদুবাস্তব বলছেন বা ‘ধুলোর দিনে ফেরা’ গল্পটিকেও একইভাবে জোর করে জাদুবাস্তবতার সীমায় বাঁধতে চেয়েছেন। এইভাবে দেখতে গেলে, আমরা গ্যালিভারস ট্রাভেলস থেকে শুরু করে ‘নার্নিয়া’, ‘লর্ড অব দ্য রিংস’-এর মতো ফ্যান্টাসি সাহিত্যকেও জাদুবাস্তবতার সীমানায় নিয়ে আসতে পারবো। কিন্তু ফ্যান্টাসি সাহিত্য তো জাদুবাস্তব না। জাদুবাস্তববাদ সাহিত্যের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি জনরা। এর ট্রিটমেন্ট গোথিক, ফ্যান্টাসি, ফেবল, ফেইরি টেলস, মিথ, ফোকলোর প্রভৃতি জনরার থেকে আলাদা।
এগুলো থেকে জাদুবাস্তববাদকে আলাদা করে বুঝে যদি আমরা শহীদুল জহিরকে পাঠ করি তাহলে স্পষ্টতই বুঝতে পারবো, শহীদুল জহির আলেহো কার্পেন্তিয়ের ও গার্সিয়া মার্কেস যে অর্থে জাদুবাস্তবতার সূচনা ও চর্চা করেছিলেন, সেই অর্থে তিনি জাদুবাস্তববাদী লেখক নন। তবে এই ঐতিহ্যের অংশ হওয়া না-হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর মহত্ত্বের একটুও কমতি হয় না। বরং উল্টো নতুন পথের অনুসন্ধানকারী হিসেবে আমরা তাঁকে আরো বেশি মহিমান্বিত করে তুলতে পারি। তাঁর মূল্য লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের সঙ্গে তুলনার মধ্যে না, বরঞ্চ বাংলার জলমাটি হাওয়া ও লোকায়ত জীবনের মোটিফ নিয়ে নতুন গল্পভাষ্য তৈরি করার মধ্যে। কাব্যিক ভাষায় মহল্লার বয়ানে তিনি যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে আনেন, সেটা আরো নতুন ব্যঞ্জনা পায় চিত্রকলার কিউবিক ফর্মের মতো অসংলগ্ন বর্ণনাশৈলির মধ্য দিয়ে। আমি কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত যখন তিনি বলেন: ‘শহীদুল জহির তার লেখার ভিতর দিয়ে একটা এ্যাটমোস্ফিয়ার তৈরি করেন, একটা আবহ তৈরি করেন, যে আবহের স্বতন্ত্র একটা চরিত্র আছে, বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষিতে যা নতুন। …শহীদুল জহির যে মেধা আর প্রজ্ঞা সমেত ভাষা ব্যবহার করেছেন তা সফলভাবেই সাহিত্যে এক নতুন এ্যাটমোস্ফিয়ারের জন্ম দিয়েছে। বাংলা কথাসাহিত্য দীর্ঘদিন ধরে, পশ্চিমবঙ্গের এবং বাংলাদেশের লেখকদের হাত ধরে যে ধারায় পুষ্টি পেয়েছে, সে ধারা থেকে শহীদুল জহির বেশ বড় একটা বাঁক নিয়েছেন। তার সঙ্গে তার পুর্বসূরিদের মিল খুব সামান্য।” [শহীদুল জহিরের দিকে দেখি] এই কারণে আমি মনে করি তাঁকে আমাদের পাঠ করতে হবে চিরাচরিত সাহিত্যপাঠের লেন্স খুলে নতুন লেন্স দিয়ে। জাদুবাস্তবতার লেখক হিসেবে চিহ্নিত করে শহীদুল জহিরের সাহিত্যের পাঠ সীমাবদ্ধ করে তুললে তাঁর সাহিত্যে যে নতুন সম্ভাবনা অন্বেষণের পথ সেটা সংকীর্ণ হয়ে আসবে।